ঢাকা , রবিবার, ১৭ মে ২০২৬ , ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কোরবানির ঈদ ঘিরে টুং টাং শব্দে মুখর কামারপাড়া

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ১৭-০৫-২০২৬ ০২:৫৪:৩৯ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১৭-০৫-২০২৬ ০২:৫৪:৩৯ অপরাহ্ন
কোরবানির ঈদ ঘিরে টুং টাং শব্দে মুখর কামারপাড়া ছবি : সংগৃহীত
পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র কিছুদিন বাকি। কোরবানির এই উৎসবকে সামনে রেখে জামালপুরের কামারপাড়াগুলোতে এখন কারিগরদের ব্যস্ততা তুঙ্গে। দিনরাত কয়লার ধোঁয়া, গনগনে লাল লোহা আর হাতুড়ি পেটানোর ‘টুং টাং’ শব্দে মুখরিত হয়ে উঠেছে জেলার কামারশালাগুলো।

নাওয়া-খাওয়া ভুলে লোহার টুংটাং শব্দে দম ফেলার ফুরসত নেই কারিগরদের। জেলার বিভিন্ন হাটবাজার ও কামারপট্টি ঘুরে দেখা গেছে উৎসবের এমন আগাম আমেজ। পশু জবাই ও মাংস কাটার প্রধান হাতিয়ার দা, বঁটি, ছুরি ও চাপাতি তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কামাররা। একদিকে যেমন চলছে নতুন সরঞ্জাম তৈরির কাজ, অন্যদিকে পুরোনো হাতিয়ারে শান দেওয়ারও ধুম পড়েছে।

বাজারে যান্ত্রিক সরঞ্জামের বিকল্প এলেও পশুর চামড়া ছাড়ানো এবং মাংস ও হাড় কাটার কাজে কামারদের হাতে তৈরি লোহার সরঞ্জামের কোনো বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি। তাই ক্রেতারা পছন্দসই ও টেকসই দা-ছুরি বানিয়ে নিতে ভিড় করছেন কামারদোকানগুলোতে।

স্থানীয় কামারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লোহার মান ও ওজনের ওপর ভিত্তি করে ছোট ছুরি তৈরিতে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, বঁটি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, চাপাতি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা ও পশু জবাইয়ের জন্য বড় ছুরি তৈরির ক্ষেত্রে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া পুরোনো দা-ছুরিতে শান দিতে নেওয়া হচ্ছে ৫০ থেকে ১৫০ টাকা। বছরের অন্য সময়ে কাজ কম থাকলেও কোরবানির এই সময়টাই তাদের আয়ের মূল মৌসুম। সারা বছর একজন কারিগর দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করলেও কোরবানির ঈদের আগে দৈনিক আয় দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়।

জেলার বিভিন্ন হাটবাজার ঘুরে দেখা গেছে, স্থায়ী কামারের দোকানের পাশাপাশি বিভিন্ন পশুর হাটের আশপাশেও কামাররা অস্থায়ী দোকান সাজিয়ে বসেছেন। অনেক জায়গায় বাড়তি কাজের চাপে মৌসুমি কারিগরও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলার পশুর হাটগুলোতে ইতোমধ্যে কোরবানির পশু কেনাবেচা শুরু হয়ে গেছে। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সারতে কামারপাড়ার এই ব্যস্ততা চলবে ঈদের দিন সকাল পর্যন্ত। কাজের চাপ সামাল দিতে তীব্র গরমের মাঝেও মুখে হাসি নিয়ে কামাররা জ্বালিয়ে রেখেছেন নেহাইয়ের আগুন; কারণ, এই একটি মৌসুমের জন্যই তারা সারা বছর অপেক্ষা করেন।

জামালপুর পৌর শহরের সকাল বাজার এলাকার কারিগর আনোয়ার হোসেন (৪৫) বলেন, ‘আমার দাদা এই কাজ করতেন। দাদার কাছ থেকে শিখে আমার আব্বা এই কাজ করেছেন, এখন আমি করছি। এই কাজটা করা এত সহজ নয়। লোহা পিটিয়ে দা-ছুরি বানানো শিখতে অনেক সাধনা করতে হয়। সারা বছর আমাদের তেমন কোনো কাজ থাকে না। যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে। কিন্তু বছরের এই সময়ে আমাদের কাজের চাপ বেড়ে যায়। আয়ও ভালোই হয়। কোরবানির ঈদের সময় যে টাকা আয় হয়, সেই টাকাটা দিয়ে সংসারের বড় কিছু করতে পারি। যেমন– গরু কিনি, জমি রাখি।’

ইসলামপুর রেলস্টেশন এলাকার এক কারিগর বলেন, ‘কয়লার দাম বাড়ায় এবার খরচ একটু বেশি। এরপরও আমরা দিনরাত পরিশ্রম করছি, যাতে ঈদের আগেই ক্রেতাদের অর্ডার বুঝিয়ে দিতে পারি। বর্তমানে আমাদের দম ফেলার সময় নেই। বছরের এই সময়টা আমার ভালোই লাগে। সারা বছর আমি কাজ পাওয়ার জন্য বসে থাকি। কিন্তু ঈদের আগে মানুষ আমার এখানে এসে বসে থাকে। বড় বড় অফিসারেরা যেমন বলেন ১ দিন পরে আসেন, তেমন আমিও বলি– এখন সময় নেই, পরে আসেন।’

সেলিম মিয়া (৪০) নামের এক মৌসুমি কারিগর বলেন, ‘আমি আমার বাবার কাছে এই কাজটা শিখেছি। আমার নিজের কোনো দোকান নেই। আমি সারা বছর যখন যে কাজ পাই, সেটাই করি। কিন্তু কোরবানির ঈদের ২০-২৫ দিন আগে অন্যের দোকানে কামারের কাজ করি। কারণ, এই কয় দিনে অনেক টাকা আয় হয়।’

চাপাতি বানাতে আসা শফিক মিয়া (৩৭) বলেন, ‘আমি চাপাতি বানাতে এসেছি। সারা বছর তো কামারের দোকানে আসা হয় না, শুধু কোরবানির সময়ই আসি। এসে তা-ও দুই ঘণ্টা ধরে বসে আছি। আরও সময় বসে থেকে হলেও বানাতে হবে, কারণ এটা তো এখন আমাদের দরকার। লোহা আমি গ্যারেজ থেকে কিনে এনেছি। এখন এটা বানাতে মজুরি চাচ্ছে ৫০০ টাকা। আমি আরও দুইটা দোকানে গিয়েছিলাম, তারাও এমনই মজুরি চাচ্ছে। কোরবানির ঈদের আমেজ কামারের দোকান থেকেই শুরু হয়।’

পুরোনো হাতিয়ারে শান দিতে আসা শাহ জালাল (৩৩) বলেন, ‘আমি কোরবানি দেব না। আমি রঙের কাজ করি, তবে ঈদের দিন কোরবানির পশু কাটার কাজ করি। আমার কাছে পশু কাটার সব হাতিয়ার আছে। বছরে এক দিন ব্যবহার করা হয় তো, তাই শান দিতে এসেছি। একেকটা শান দিতে একেক রকম দাম নিচ্ছে– ছোট ছুরি ৪০, মাঝারিটা ৬০ আর চাপাতি ১৪০ টাকা।’

সার্বিক বিষয়ে জামালপুরের জেলা প্রশাসক ইউসুপ আলী বলেন, ‘কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে আমাদের সব রকমের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। পশুর হাটের পাশাপাশি কোরবানির ঈদের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবকিছুই আমরা মনিটরিং করছি।’
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ